মন্দ ধারণা : এক বিষাক্ত তীরঃ ২

 *মন্দ ধারণা : এক বিষাক্ত তীর:*


----------------- *[পার্ট :০২]*------------------


অহেতুক এ মন্দ ধারণা সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে----


*إِيّاكُمْ وَالظّنّ، فَإِنّ الظّنّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ.*


*অর্থ :* তোমরা মন্দ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা মন্দ ধারণাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মিথ্যা। *[সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৪৩]*


প্রমাণহীন এ মিথ্যা ধারণা যে মানুষের জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে ফেলতে পারে, এর একটি দৃষ্টান্ত লক্ষ করুন। ঘটনাটি সরাসরি নবীজী *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* এর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।


এক যুদ্ধে তিনি আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)কে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন পর্দার বিধান অবতীর্ণ হয়ে গেছে।নবীজী *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* এর সফরের নিয়ম ছিল তিনি প্রথমে একটি হাওদায় উঠতেন, এরপর সে হাওদাটি বসানো হতো উটের পিঠে এবং তা টেনে নিয়ে যাওয়া হতো। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে গভীর রাতে কাফেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি করল। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)ও নামলেন। শেষ রাতে তিনি নিজ প্রয়োজন সেরে নেয়ার জন্যে কাফেলা থেকে কিছুটা দূরে চলে গেলেন। এরপর আবার ফিরেও এলেন।


কিন্তু এসে দেখেন, তাঁর গলার হারটি নেই। তিনি একাকীই তা খুঁজতে চলে গেলেন। অবশেষে তা পেয়েও গেলেন। তিনি আবার ফিরে এলেন। কিন্তু এসে দেখেন, কাফেলার সকলেই চলে গেছে। তখনকার নারীরা এমনিতেই খুব হালকা গঠনের ছিলেন। আবার তিনি ছিলেন খুবই অল্পবয়স্কা। ফলে তাঁর হাওদাটি যখন উঠানো হচ্ছিল উটের পিঠে, কেউ আঁচই করতে পারেনি তিনি ভেতরে নেই। তাই তাঁরা চলে গেলেন।


এদিকে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) এসে যখন দেখলেন সকলেই চলে গেছে, তিনি তাঁর জায়গায় এ ভেবে বসে পড়লেন কাফেলার লোকেরা যখন জানতে পারবে যে, তিনি নেই, তখন তাঁরা আবার তাঁর সন্ধানে আসবে। এ ভাবনা থেকে তিনি বসে রইলেন। এরই এক পর্যায়ে তিনি ঘুমিয়েও পড়লেন। তিনি ছিলেন চাদরাবৃত।এদিকে নিয়ম মোতাবেক হযরত সাফওয়ান (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহু) ছিলেন সবার পেছনে।কোনো কিছু থেকে গেলে যেন নিয়ে যেতে পারেন, এজন্যেই এ ব্যবস্থা ছিল।


তিনি প্রথমে দেখলেন মানুষের মতো কী যেন দেখা যায়। এরপর কাছে এসে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)কে চিনতে পারেন। কারণ পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি তাঁকে দেখেছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি উঁচু আওয়াজে ‘ইন্না লিল্লাহ্’ পড়েন। এ আওয়াজে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)এর ঘুম ভেঙে গেল।


তাদের মাঝে আর কোনো কথা হয়নি। হযরত সাফওয়ান (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহু) উটটিকে বসিয়ে দিলেন আর আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) তাতে চড়ে বসলেন। এরপর হযরত সাফওয়ান (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহু) তা টেনে নিয়ে চললেন। যখন তাঁরা কাফেলার সঙ্গে মিলিত হলেন তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে।

এখান থেকেই শুরু সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার।


মুনাফিক 'আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই ইবনে সালুল রটিয়ে দিল আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)এর নামে অপবাদ। তাঁর সাথে যুক্ত হল মুনাফিকদের দল, এই ফাঁদে আটকে গেল সরল বিশ্বাসী কয়েকজন খাঁটি মুমিনও। এভাবে চলতে থাকল দিনের পর দিন। অবস্থা তখন এতটাই সঙ্কটপূর্ণ যে, স্বয়ং নবীজী *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না তিনি কী করবেন।


হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)এর সঙ্গে তিনি কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছেন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) অবশ্য বিষয়টি জানতে পেরেছেন অনেক পরে। প্রথমে তিনি ছিলেন অসুস্থ। এসব কথা জানতে পেরে তাঁর অসুস্থতা আরও বেড়ে গেল। একপর্যায়ে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)কে রাসূলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* বললেন, ‘আয়েশা! তোমার সম্পর্কে এমন এমন কথা আমার কানে এসেছে। তুমি যদি এসব থেকে পবিত্র হয়ে থাক তবে আল্লাহ্ অবশ্যই তোমাকে এ সংকট থেকে উদ্ধার করবেন।আর যদি কোনো অন্যায় তুমি করে থাক, তবে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে তওবা করো। কারণ বান্দা যখন পাপ স্বীকার করে তওবা করে, আল্লাহ্ তা'আলা সে তওবা কবুল করেন।’


আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) তখন তাঁর বাবা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহু)কে বললেন, আপনি আমার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* এর কথার জবাব দিন।


তিনি বললেন : আমি কী বলব জানি না।এরপর হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) মায়ের কাছে বললেন, আপনি আমার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* এর  জবাব দিন।তিনিও একই উত্তর দিলেন আমি কী বলব জানি না।এমন পরিস্থিতিতে হযরত আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) নিজেই বলতে শুরু করলেন আমি জানতে পেরেছি, আপনারা আমার সম্পর্কে এসব কথা শুনতে পেয়েছেন এবং এগু লোকে বিশ্বাসও করেছেন। আপনাদের মনে এ বিষয়ে স্থির বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। এখন আমি যদি বলি আমি এসব থেকে মুক্ত, তবে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। এ ঘটনায় না জড়িয়েও আমি যদি বলি, আমি তা করেছি, তাহলেই কেবল আপনারা বিশ্বাস করবেন।


তাই এ মুহূর্তে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের বাবা যে কথা বলেছিলেন, আমিও আমার ও আপনাদের জন্যে তাই বলছি---


*فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ.*


আমার জন্য পূর্ণ ধৈর্যধারণই শ্রেয়। আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহর কাছেই  সাহায্য চাই।


এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* এর উপর ওহী অবতীর্ণ হল। ওহীর সে বাণীতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা)কে সুস্পষ্টভাবে নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক হিসেবে ঘোষণা করা হল। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নেমে এল একসঙ্গে সূরা নূরের দশটি আয়াত। *[দ্র. সহীহ বুখারী, হাদীস ৪১৪১]*

আরো দেখুন...

*(চলবে ইনশাআল্লাহ্)*

No comments

Powered by Blogger.