মন্দ ধারণা : এক বিষাক্ত তীর: ৩
*মন্দ ধারণা : এক বিষাক্ত তীর:*
----------------- *[শেষ:পার্ট]*------------------
সূরা নূরের দশটি আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়েছিল এর মধ্যে এ আয়াতটিও ছিল---
*لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ .*
তোমরা যখন বিষয়টি শুনেছিলে, তখন মুমিন নর-নারীরা কেন নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করল না আর বলল না এ এক মহা অপবাদ!
এখানে কথা স্পষ্ট মুমিনদের সম্পর্কে মন্দ কিছু শুনলেই তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা যাবে না, তা বলে বেড়ানো যাবে না। যতদূর সম্ভব, একজন মুমিন সম্পর্কে ভালো ধারণাই পোষণ করতে হবে। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসা অটুট থাকবে, দিন দিন বৃদ্ধি পাবে।
কারও কোনো মন্দ বিষয় সম্পর্কে কেউ যদি সুনিশ্চিতভাবে জানতে পারে, তবুও তো বলে বেড়ানোর সুযোগ নেই। এটা গীবত। সেখানে কেবলই ধারণার ভিত্তিতে কারও সম্পর্কে একটি বিষয় নিজের মনে স্থির করে নেয়া এবং তা ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ কোথায়!আর কেউ যদি কারও সামনে একটি পাপ করে, তবে এ সম্পর্কে তাঁর তো নিশ্চিত জ্ঞানই অর্জিত হবে। কিন্তু একটি পাপ করেছে বলে ধারণাবশত এর অনেক শাখা-প্রশাখা বের করে সবকিছুই তার সঙ্গে জুড়ে দেয়ারও কোনো বৈধতা নেই।
মন্দ ধারণার মধ্যে কোনো ভাগাভাগি নেই। আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিআল্লাহু তা'আলা 'আনহা) এর প্রতি যে বিষয়ে মন্দ ধারণা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তা তো একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সতীত্ব। যদি এর চেয়ে হালকা কোনো বিষয়ও হয়, তবুও মন্দ মন্দই। মন্দ ধারণামাত্রই ইসলামে নিষিদ্ধ।
অনেকসময় কারও মধ্যে কোনো মন্দ কাজের আলামত দেখেই আমরা মনে মনে স্থির করে নিই সে এই কাজে জড়িয়েছে। ধীরে ধীরে এ ধারণা প্রবল হতে থাকে। একপর্যায়ে তা স্থির বিশ্বাসে পরিণত হয় এবং এরপর চলতে থাকে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। অথচ সবকিছুর মূলে সামান্য একটু আলামত, যার ভিত্তিতে করা ধারণাটি ঠিক হতেও পারে, নাও হতে পারে। এভাবেই মন্দ ধারণা খুলে দেয় একে একে অনেক পাপের দুয়ার মিথ্যা, গীবত, অপবাদ ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা তাই আমাদেরকে গোড়া থেকেই এসব পাপের পথ পরিহার করতে শিখিয়েছেন এবং মন্দ ধারণা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
অনেকসময় নিজের অজান্তেই কোনো পরিস্থিতিতে কারও সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো ধারণা মনে জন্মায়। হয়তো এর পেছনে কোনো আলামত থাকে। অনিচ্ছাকৃত এতটুকু ধারণার জন্যে অবশ্য কোনো জবাবদিহিতা নেই।কিন্তু এ ধারণাকে যদি ইচ্ছাকৃত মনে পুষে স্থির বিশ্বাসে পরিণত করা হয় তবেই সংকট। এটা জায়েয নয়।এজন্যে প্রয়োজন শুরু থেকেই মন্দ ধারণার প্রতিরোধ। কারও সম্পর্কে মন্দ কিছু মাথায় এলে তা দূর করার চেষ্টা করা, এর ভালো কোনো সম্ভাব্য দিক খুঁজে বের করা এবং নিজের দোষত্রুটির প্রতি দৃষ্টি দেয়া।
লেনদেনের সময় কোনো একজন কথামতো কাজ নাও করতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারও সঙ্গে নতুন লেনদেনের সময় তাই এ ধারণার ভিত্তিতে সচেতনতা অবলম্বন করা দূষণীয় নয়। এ ধারণাটুকু যদিও একরকম মন্দ মনে হয়, কিন্তু এতে কোনো অসুবিধে নেই। এর ভিত্তিতে সচেতন হওয়া বরং কাম্য। লেনদেনে স্বচ্ছতা ও লেনদেন নিরাপদ হওয়া ইসলামের শিক্ষা।ঋণ আদান-প্রদান, বাকিতে লেনদেনের সময় লিখে রাখা, সাক্ষী রাখা ইত্যাদি কুরআনেরই নির্দেশনা।
গোনাহ হবে তখন, যখন কারও সম্পর্কে ভিত্তিহীন কোনো ধারণা কেউ মনে স্থির করে নেবে। কারও প্রতি এভাবে মন্দ ধারণা পোষণ করা অন্যায় ও হারাম। যদি কেউ একান্তই নিজের মনে তা পোষণ করে, অন্য কারও কাছে না বলে তবুও তা হারাম। আর যদি তা বলে বেড়ায়, তবে এর সঙ্গে যোগ হবে মিথ্যা ও অপবাদের গোনাহ। বিষয়টি যদি সত্য হয় তবুও গীবতের গোনাহ তো হবেই। কারও দোষ তাঁর আড়ালে বলে বেড়ানোর সুযোগ ইসলামে নেই।
নবীজী *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* এর হাদীস তিনি একদিন সাহাবীগণকে গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।নবীজী *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* বললেন---
*ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ.*
তোমার ভাইয়ের এমন বিষয়ের আলোচনা, যা সে অপছন্দ করে।
সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এ দোষটি যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থেকে থাকে, তবুও কি গীবত হবে?নবীজী *(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)* বললেন---
*إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتّهُ.*
তুমি যা বলেছ তা যদি তাঁর মধ্যে থাকে তবেই তো তুমি তাঁর গীবত করলে। আর যদি তাঁর মধ্যে সে দোষটি না থাকে তবে তো তুমি তাকে অপবাদ দিলে! *[সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮৯]*
মন্দ ধারণার এ তীর তাই খুবই বিষাক্ত। এর বিষক্রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে সমূলে তা উৎখাত করতেই হবে। যখনই কারও সম্পর্কে মন্দ কিছু মনে আসবে তখনই। এ নিয়ে কোনো বিলম্ব নয়। শান্তিময় সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্যে তা অনিবার্য।
আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে হেফাজত করেন। নেক আমল করার তাওফীক দান করেন।আমীন..!
No comments